• ই-পেপার

খেলোয়াড়দের এগিয়ে নিতে হবে

<li>আবদুস সাদেক, বাংলাদেশের কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ</li>

রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও শিল্পীর মুক্তি

ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও শিল্পীর মুক্তি

প্রথম কথা হচ্ছে, শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মীদের তো লেজুড়বৃত্তি করার কথা নয়। কোনো ব্যক্তি বা দলের লেজুড় হওয়া তার কাজ নয় কোনোভাবেই। বরং বলা যায়, এটাই কোনো শিল্পীর জন্য প্রথম ও মৌলিক ডিসকোয়ালিফিকেশন। কারণ শিল্প বলতে বুঝি এমন এক ধরনের সৃজনশীল চর্চা, যা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নতুন কোনো অর্থ বা ব্যঞ্জনা তৈরি করতে চায়। আর সেই অর্থ বা ব্যঞ্জনাগুলো ঐতিহাসিকভাবেই মূলত ক্ষমতাশালী মানুষদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েই নির্মিত হয়েছে।

যদি আমরা শিল্প ও সংস্কৃতির উৎসর দিকে তাকাই, একেবারে মানব ইতিহাসের শুরুতে, গুহামানবদের যুগে; দেখি, তারা শিকারের প্রয়োজন থেকেই গুহার দেয়ালে ছবি এঁকেছে। এই ছবি আঁকা ছিল এক ধরনের পরিকল্পনা, যার মহড়া বা চর্চা থেকে এসেছে কৃত্যমূলক পরিবেশনা, যা আমাদের থিয়েটারের আদি রূপ বলে বিবেচিত। এখান থেকেই চিত্রকলার সূচনা এবং থিয়েটার বা পারফরমিং আর্টের ধারণা পাই। অর্থাৎ শিল্প কখনোই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় হিসেবে শুরু হয়নি, কিংবা শুধু বিনোদনের জন্য তৈরি হয়নি। সামাজিক ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে বোঝা যায়, মানুষ যত বেশি সামাজিক হয়েছে, সমাজ যত জটিল হয়েছে, ততই এই কৃত্যমূলক পরিবেশনাগুলো দৈনন্দিন জীবনের অংশ হিসেবে বিকশিত হয়েছে।

পরবর্তীকালে মানবসমাজ যখন জটিলতর হয়েছে, বিশেষ করে যখন উদ্বৃত্তের ধারণা এসেছে; তখনই শিল্প, কবিতা, গান ও পরিবেশনাগুলো ধীরে ধীরে আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। তবে উদ্যান কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতেও আমরা দেখি, জীবনের সঙ্গে শিল্পের নিবিড় সম্পর্ক। উদ্যান কৃষিভিত্তিক সমাজে চাষাবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত গান, জুম চাষের সময় গাছ পোড়ানোর ঐতিহ্যএসবই শিল্পের আদিম
রূপ। জীবনের জৈবিক প্রয়োজন থেকেই ধীরে ধীরে শিল্প বিকশিত হয়েছে।

কিন্তু কৃষি সভ্যতায় উদ্বৃত্ত তৈরি হওয়ার পর আমরা দেখি, জীবন ও সংস্কৃতির সংযোগ থেকে শিল্প কিছুটা আলাদা একটি পরিসরে চলে যায়। একটি শ্রেণি তৈরি হয়, যারা দৈনন্দিন জীবিকার বাইরে গিয়ে শিল্প চর্চা করতে পারে, যা আগে অসম্ভব ছিল। কারণ উদ্বৃত্ত না থাকলে মানুষকে সর্বোচ্চ সময় বেঁচে থাকার জন্য দুষ্প্রাপ্য খাদ্য সংগ্রহেই ব্যয় করতে হতো।

আমরা দেখি, প্রকৃতির শক্তিগুলোবৃষ্টি, বাতাস, বজ্র, সাগর উপাসনার বিষয় হয়ে ওঠে। উপাসনার অংশ হিসেবেই গান, নৃত্য ও বিভিন্ন পরিবেশনা ব্যবহৃত হতে থাকে। মানুষ যেসব অতিপ্রাকৃত শক্তিকে ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেগুলোর প্রতি সমর্পণের ভাষা হয়ে ওঠে নানা পরিবেশনা। পরে উন্নত কৃষি সমাজে এসে, যেখানে স্রষ্টা ও রাজাকে অনেক সময় সমার্থক হিসেবে দেখা হতো, সেখানে ঈশ্বরের গুণকীর্তনের পাশাপাশি রাজা বা ক্ষমতাশালীদের গুণকীর্তনও যুক্ত হয়। এভাবেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ঘরানা তৈরি হয়।

তবে শিল্প বিপ্লবের পর আমরা দেখি, শিল্পে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ, চাওয়া-পাওয়া ও অনুভূতিগুলো গুরুত্ব পেতে শুরু করে। তার আগে মানবিক কনটেন্টকে অনেক সময় ভালগার বা অশ্লীল বলে চিহ্নিত করা হতো, কারণ শিল্পকে তখন এক ধরনের মহিমান্বিত ও দূরবর্তী বিষয় হিসেবে ভাবা হতো। আজকের কনটেম্পোরারি শিল্পচর্চায় আমরা দুটি ধারা দেখিএকটি ধারা মনে করে শিল্প শুধু শিল্পের জন্য, মানুষের মনন ও মেধার উৎকর্ষের জন্য। আরেকটি ধারা মনে করে, শিল্পকে সব সময় ক্ষমতাশালীদের বয়ানের বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে, প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে হবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত মনে করি। আমার কাছে শিল্পের মূল কাজই হলো ক্ষমতা সম্পর্ককে প্রশ্নের মুখে রাখাযে ক্ষমতা মানুষকে, প্রকৃতিকে কিংবা বিভিন্ন জাতিসত্তাকে প্রান্তিক করে। এই জায়গা থেকে দাঁড়ালে লেজুড়বৃত্তির কোনো সুযোগই থাকার কথা নয়। কিন্তু ইতিহাসে আমরা দেখেছি, শিল্পীরা তা করেছেন। শিল্পকে ওপরে ওঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজানুগ্রহ পাওয়ার জন্য শিল্পীরা রাজাদের প্রশস্তি লিখেছেন।

ফেরদৌসির শাহনামার ক্ষেত্রেই আমরা দেখি, ফেরদৌসি যে কাহিনি লিখেছেন, সেগুলো ইসলামের বহু আগের পারস্য ও সুমেরীয় সভ্যতার ইতিহাস। রাজাকে খুশি করার তাগিদ থাকলেও তিনি রাজা বা ইসলামের প্রচার করেননি, বরং প্রাচীন ঐতিহ্যকেই তুলে ধরেছেন। এখানেই শিল্পের সাবভারসিভ চরিত্রটি ধরা পড়ে, বাইরে থেকে রাজানুগত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে ভিন্ন স্রোত বইতে পারে।

তবু আমার বিশ্বাস, শিল্পীদের দুর্বলের ও প্রান্তিকের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে পৃথিবীকে আমরা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছি। এই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জীবনের কথা বলতে হলে শিল্পীদেরই প্রয়োজন। যারা ধ্বংস করে, তাদের পক্ষে শিল্পী লেজুড়বৃত্তি করতে পারে না, করলে সে আর শিল্পী থাকে না।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো শিল্পচর্চার জন্য একটি মুক্ত পরিসর তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, পরিচয়ভিত্তিক অসহিষ্ণুতা রাজনৈতিক পরিসর ছেড়ে সামাজিক পরিসরে ঢুকে পড়েছে। এখন আর প্রশ্নটা রাজনৈতিক দলের নয়; প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আমি যেমন, তোমাকেও তেমন হতে হবে। ভিন্নতা মানেই বাতিল।

এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। কারণ সংস্কৃতি শুধু নাচ-গান নয়; সংস্কৃতি মানে মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সামাজিকীকরণের পদ্ধতি। বাংলাদেশে ভিন্নতাকে অস্বীকার করার এই প্রবণতা ঐতিহাসিকভাবে ছিল না। বঙ্গ ছিল এক ধরনের গর্ত, যেখানে নানা দিক থেকে বিতাড়িত, প্রান্তিক মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছে। একসঙ্গে বন কেটে বসতি করেছে। এই বহুত্ববাদই ছিল আমাদের শক্তি, যার জোরে আমরা নানা শাসককে বিদায় করেছি।

আমি নিজে সত্তর-আশির দশকে বড় হয়েছি, তখন পরিচয় কখনো বন্ধুত্বের শর্ত ছিল না। আজ তা হয়ে উঠেছে। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক ডানপন্থী রাজনীতির প্রভাব। ট্র্যাডিশনাল ভ্যালু খুঁড়ে এনে ভিন্নতাকে দমন করা হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের লোকসংস্কৃতির দিকে তাকানো জরুরি। সঙযাত্রা, পালাগানএসব ছিল দরিদ্র কৃষকদের শিল্প, যেখানে পৃষ্ঠপোষককেই ব্যঙ্গ করা হতো। পালাগানে বিতর্কের মাধ্যমে বিশ্বাস ও প্রশ্ন উন্মুক্ত হতো। বাংলায় ইসলামের প্রসারও ঘটেছে এমন সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে, যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ ছিল না।

আজ সেই ঐতিহ্য ভেঙে পড়ছে। পালাগানের শিল্পী আবুল সরকারকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটি আমাদের সহিষ্ণুতার ইতিহাসের ওপর বড় আঘাত। রাজনৈতিক অথরিটারিয়ানিজম থেকে আমরা হয়তো বের হচ্ছি, কিন্তু সামাজিক অথরিটারিয়ানিজমে ঢুকে পড়লে বিপদ আরো বড়।

আমাদের কাওয়ালি যেমন দরকার, তেমনি পালা ও যাত্রাও দরকারএকটিকে বাদ দিয়ে আরেকটিকে রাখা নয়; সহাবস্থান ও সহিষ্ণুতার ঐতিহ্যেই আমাদের টিকে থাকা জরুরি। সেই জায়গাতেই যেন আমরা থাকতে পারিনতুন বছরে এটাই আমার আশা।

 

অনুলিখন : মানজুর হোছাঈন মাহি

 

দৃশ্যমাধ্যম এখন রাজপথ

সিনেমা, ছবি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা

অমিতাভ রেজা চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠাতা, সিনেমা পাঠশালা

সিনেমা, ছবি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা
জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী চলচ্চিত্রের দুটি দৃশ্য। এই চলচ্চিত্র আবারও দেখিয়েছে, ভিজ্যুয়াল ভাষা কিভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে

আমি বিশ্বাস করি, দৃশ্যমাধ্যম শুধু একটি ভাষা নয়, এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো। শব্দ যুক্তি তৈরি করে, কিন্তু দৃশ্য জাগিয়ে তোলে আবেগ। ইতিহাসের প্রতিটি বড় সামাজিক আন্দোলনের দিকে তাকালেই দেখা যায়, সিদ্ধান্তের মুহূর্তে মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে একটি দৃশ্যকোনো ভাষণ নয়, কোনো লেখা নয়। এই ভূখণ্ডে দৃশ্যমাধ্যমের ইতিহাস সে সত্যই বলে। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে ক্যামেরার ফ্রেমে বাঙালির   সিনেমা, ছবি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষাজীবনকে ধরে রাখার যাত্রা শুরু হয়েছিল হীরালাল সেনের হাত ধরে। তখন দৃশ্য ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। পাকিস্তান আমলে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে ভাষার প্রতিরোধ। স্বাধীনতার পর সিনেমা হওয়ার কথা ছিল জাতীয় কণ্ঠস্বর। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সিনেমা কোনো দিনই শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি। হল কমেছে, দর্শক সরে গেছে, বড় পর্দা তার কেন্দ্রীয়তা হারিয়েছে। ফলে বহু বছর ধরেই আমরা শুনে আসছি, সিনেমা মারা গেছে। প্রশ্ন হলো, সিনেমা কি সত্যিই মারা গেছে, নাকি সে শুধু জায়গা বদলেছে?

 

জুলাই আন্দোলন ও দৃশ্যের শক্তি

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন সেই প্রশ্নের উত্তর নতুন করে দিয়েছে। এই আন্দোলনের কোনো একক ইশতেহার ছিল না, কোনো কেন্দ্রীয় প্রচারদল ছিল না। ছিল কিছু ছবি, কিছু ভিডিও, মোবাইল ফোনে ধারণ করা কাঁপা ফ্রেম, লাইভ স্ট্রিম, রক্তমাখা শার্ট, ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের চোখ।

আন্দোলনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে আবু সাঈদের ছবি। তাঁর রক্তাক্ত শরীরের দৃশ্য কোনো পরিকল্পিত প্রচারণা ছিল না, তবু তা একটি প্রজন্মের ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এই ছবিগুলো দেখে অসংখ্য তরুণ সিদ্ধান্ত নেয় রাস্তায় নামার, বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর। এখানেই দৃশ্যভাষার প্রকৃত শক্তিএটি মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, মানুষকে বদলে দেয়। রাষ্ট্রের ভাষা যেখানে ব্যর্থ হয়, দৃশ্য সেখানে কথা বলে। একটি স্থিরচিত্র কখনো কখনো হাজার শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জুলাই আন্দোলন আমাদের সামনে আবারও দেখিয়েছে, ভিজ্যুয়াল ভাষা কিভাবে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

 

বড় পর্দা নয়, ব্যক্তিগত স্ক্রিন

আজকের দিনে সিনেমা আর শুধু প্রেক্ষাগৃহে বন্দি নেই। সিনেমা এখন ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রাম রিলসে, টিকটকে। ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও অনেক সময় দুই ঘণ্টার চলচ্চিত্রের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে। কারণ এটি তাত্ক্ষণিক, ব্যক্তিগত এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো।

আজকের গল্প মুক্তির তারিখের অপেক্ষা করে না। গল্প পোস্ট হয়, শেয়ার হয়, ভাইরাল হয়। প্রথম তিন সেকেন্ডেই দর্শক সিদ্ধান্ত নেয় সে থাকবে, নাকি স্ক্রল করবে। ফলে দৃশ্যভাষা আরো তীক্ষ, আরো সংক্ষিপ্ত, আরো আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। এই নতুন বাস্তবতায় নির্মাতা মানেই শুধু শিল্পী নন, তিনি সচেতন বা অচেতনভাবে রাজনীতির অংশ।

 

স্ট্রিমিং, অর্থনীতি ও নতুন সিনেমা-বাস্তবতা

আজকের দিনে সিনেমা বোঝার সবচেয়ে বড় ভুল হলো, একে এখনো শুধু বড় পর্দার সঙ্গে আটকে রাখা। বাস্তবতা হলো, সিনেমা তার ঠিকানা বদলেছে। সে এখন ব্যক্তিগত স্ক্রিনেমোবাইল ফোনে, ট্যাবলেটে, ল্যাপটপে, টেলিভিশনের স্মার্ট অ্যাপে। এই পরিবর্তন শুধু দর্শকের অভ্যাস বদলায়নি; এটি সিনেমার অর্থনীতি, রাজনীতি এবং ক্ষমতার কাঠামোই আমূল বদলে দিয়েছে। স্ট্রিমিং দুনিয়ার সমকালীন আলোচনায় এখন একটি নাম ঘুরেফিরে আসছে—Adolescence । প্রায় সবাই দেখেছে, বা দেখবে। এই সিরিজের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ, নৈতিক প্রশ্নএসব নিয়ে অচিরেই প্রচুর আলাপ হবে। তথাকথিত পাকনা পাকনা সিনেমা সমালোচকরা টেবিল চাপড়াতে চাপড়াতে এর ডিসেকশন করবেন; ফ্রেম, থিম, সাবটেক্সট, রিপ্রেজেন্টেশন নিয়ে তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলবে। সেটি প্রয়োজনীয়ও বটে।

  সিনেমা, ছবি ও নতুন রাজনৈতিক ভাষাকিন্তু আমি একটু ভিন্ন হিসাব দিতে চাইইমোশন নয়, অর্থনীতির হিসাব।

এই সিরিজের নির্মাণ ব্যয় কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইন্ডাস্ট্রি সূত্র ধরে অনুমান করা হয়, Adolescence-এর প্রতিটি পর্বের খরচ ১৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। খুব সংযত হিসাব ধরলেও যদি আমরা প্রতিটি পর্বের খরচ ২০ মিলিয়ন ডলার ধরি, তাহলে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা প্রতি পর্বে।

এবার আসি দর্শকসংখ্যায়। অফিশিয়াল হিসাবে জানা যায়, সিরিজটি প্রথম চার দিনে দেখেছে প্রায় ২৪.৫ মিলিয়ন দর্শক। ধরুন, এদের সবাই নতুন সাবস্ক্রাইবার নয়, অনেকে পুরনো। তবু যদি আমরা খুব সাধারণ একটি অর্থনৈতিক অনুমান করি : নেটফ্লিক্সের গড় সাবস্ক্রিপশন ফি ধরা যাক মাসে ১৫ ডলার। তাহলে অঙ্কটা দাঁড়ায় এমন

২৪.৫ মিলিয়ন x ১৫ ডলার = ৩৬৭.৫ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা, মাত্র এক মাসে, মাত্র একটি কনটেন্ট থেকে!

এখন এই সংখ্যার পাশে যদি আমরা আমাদের পরিচিত সিনেমা বাস্তবতাকে বসাই, তাহলে বিষয়টি প্রায় অবাস্তব মনে হয়। বাংলাদেশের একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র যেখানে ৫-১০ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে সংগ্রাম করে, সেখানে একটি স্ট্রিমিং সিরিজের একটি পর্বের বাজেটই ২০০ কোটির ওপরে। শুধু তা-ই নয়, এই বিনিয়োগ শুধু ফিরে আসে না, এটি একটি কনটেন্টকে কেন্দ্র করে পুরো প্ল্যাটফর্মের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে। আর এখানেই আসল বিষয়টি পরিষ্কার হয়নেটফ্লিক্স কোনো সিনেমা বানাচ্ছে না, তারা একটি ইকোসিস্টেম বানাচ্ছে। আজ নেটফ্লিক্সের মোট কনটেন্ট লাইব্রেরির আকার আনুমানিক আট হাজার ৫০০টিরও বেশি। এর মানে,

 Adolescence একা কোনো দ্বীপ নয়; এটি একটি বিশাল কনটেন্ট মহাসাগরের অংশ। একজন দর্শক একটি সিরিজ দেখতে এসে আরেকটি দেখে, তারপর আরেকটি। সাবস্ক্রিপশন চলতেই থাকে। সিনেমা এখানে আর ইভেন্ট নয়; সিনেমা এখানে অভ্যাস।

এ কারণেই বড় পর্দা বনাম ছোট পর্দার বিতর্ক আজ অপ্রাসঙ্গিক। প্রশ্ন আর কোথায় দেখা হচ্ছে নয়; প্রশ্ন হলো, কার হাতে নিয়ন্ত্রণ? হল মালিকের? প্রযোজকের? নাকি অ্যালগরিদমের?

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে সিনেমা এখন অ্যালগরিদমচালিত। কোন গল্প দেখা হবে, কোনটা চাপা পড়বে, তা অনেক সময় দর্শকের রুচির চেয়েও বেশি নির্ধারণ করে ডেটা। একই সঙ্গে এটি নির্মাতাদের এমন স্বাধীনতাও দিচ্ছে, যা বড় পর্দা কোনো দিন দিতে পারেনি। সেন্সর নেই, শো টাইমের চাপ নেই, প্রথম সপ্তাহের বক্স অফিস নেই। আছে শুধু দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। এই বাস্তবতা বুঝেই সম্ভবত ফরাসি নিউ ওয়েভের কিংবদন্তি নির্মাতা জ্যঁ-লুক গদার বলেছিলেন,  I await the end of cinema with optimism.

এই উক্তি অনেকেই ভুল বোঝেন। এটি সিনেমার মৃত্যুর আনন্দ নয়; এটি সিনেমার রূপান্তরের আশাবাদ। গদার জানতেন, সিনেমা একটি নির্দিষ্ট যন্ত্র বা পর্দার নাম নয়; সিনেমা একটি ভাষা। আর ভাষা কখনো মরে না, সে রূপ বদলায়। আজকের ব্যক্তিগত স্ক্রিন সেই রূপান্তরের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ। সিনেমা এখন একা বসে দেখা হয়, কিন্তু একা অনুভূত হয় না। একটি সিরিজ দেখে মানুষ সঙ্গে সঙ্গে ফেসবুকে লেখে, রিল বানায়, টিকটকে রিঅ্যাক্ট করে। দর্শক আর নীরব নয়; সে বয়ানের অংশ।

তাই আজ যখন আমরা বলি বড় পর্দা নয়, ব্যক্তিগত স্ক্রিন, তখন এটি কোনো নস্টালজিক আক্ষেপ নয়। এটি একটি বাস্তব স্বীকারোক্তিক্ষমতা স্থানান্তরিত হয়েছে। আর এই নতুন বাস্তবতায় সিনেমা আরো বেশি সমকালীন, আরো বেশি রাজনৈতিক, আরো বেশি অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

সিনেমা শেষ হয়নি। সে শুধু নিজের জায়গা বদলেছে।

 

সিনেমা কি মৃত?

অনেকে বলেন, এই সবকিছু মিলিয়ে সিনেমার নান্দনিকতা নষ্ট হচ্ছে। আমি বলি, সিনেমার দায়িত্ব বদলাচ্ছে। আজকের দৃশ্য আর নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি ফ্রেম একটি অবস্থান। আপনি কী দেখাচ্ছেন, কী লুকাচ্ছেনসবই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

হীরালাল সেনের সময় থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের মোবাইল ভিডিও পর্যন্ত্তএই দীর্ঘ যাত্রায় একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে : মানুষ নিজের কথা বলতে চায়। মাধ্যম বদলায়, পর্দা ছোট হয়, ফ্রেম কাঁপেকিন্তু বয়ান থেমে থাকে না। আজ সিনেমা আর শুধু হলে নেই। সিনেমা এখন রাজপথে, মানুষের হাতে, মানুষের ফোনে। আর যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন থাকবে, তত দিন দৃশ্যমাধ্যম শুধু শিল্প নয়; একটি জীবন্ত রাজনৈতিক ভাষা হিসেবেই বেঁচে থাকবে।

 

শেষকথা

এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো পরিবেশ তৈরি করা। একটি ভালো সিনেমা একা কিছু বদলায় না। একজন প্রতিভাবান নির্মাতাও একা টিকে থাকতে পারে না। দৃশ্যমাধ্যম বাঁচে ইকোসিস্টেমে। আর সেই ইকোসিস্টেম তৈরি করার সময় এখনই।

 

 

স্টার্টআপ ও বাংলাদেশ

এ এন এম সফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত সচিব, স্টার্টআপ ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ

স্টার্টআপ ও বাংলাদেশ

বর্তমানে স্টার্টআপ নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি বাণিজিকীকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে শক্তিশালী খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্রেডেরিক টারম্যানের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সিলিকন ভ্যালি আজ বিশ্বব্যাপী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের অনুপ্রেরণা। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত  Stanford Research Park ছিল বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়চালিত গবেষণা পার্ক, যা HP, Lockheed Martin, Xerox PARC, Google, NVIDIA, Cisco -র মতো টেক জায়ান্টের উত্থান ঘটেছে। শিক্ষণ, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সমন্বয়ে সিলিকন ভ্যালি আজ স্টার্টআপের কেন্দ্রবিন্দু ও মডেল।

স্টার্টআপ ও বাংলাদেশবর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্সসহ উন্নত দেশগুলো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এশিয়ায় চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়া, হংকং শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশও দ্রুত বিকাশমান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে পরিণত হচ্ছে। বিকাশ ও নগদের সাফল্য দেশকে বৈশ্বিক মানচিত্রে পরিচিত করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করলেও সম্ভবনার নিরিখে অগ্রযাত্রা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়।

বাংলাদেশে তরুণরা অনেক উদ্যমী ও উদ্যোগী। তরুণরা এখন স্বপ্ন দেখে উদ্যোক্তা হওয়ার। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ৩৩ শতাংশ মানুষের বয়স ৩০-এর নিচে। এই তরুণদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় চাকরির পাশাপাশি ব্যবসাও পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামো নীতি সহায়তার অপ্রতূলতার মধ্যেও তারা উদ্যোক্তা হওয়ার কথা ভাবছে। বাংলাদেশের স্টার্টআপদের মধ্যে চাল শপআপ, চালডাল, ফুড পান্ডা, আরোগ্য ইত্যাদি সফল স্টার্টআপ উদ্যোগগুলো তরুণদের সাহস জোগাচ্ছে। তবে বাংলাদেশে স্টার্টআপগুলো মূলত আইসিটি, ফিনটেক, হেলথটেক, ইডোটেক, এগ্রোটেক, বি২বি/ লজিস্টিক, সাপ্লাই চেন, গ্রিনটেক ইত্যাদি স্টার্টআপ দেখা যায়। নতুন স্টার্টআপ হিসেবে উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগ উদ্যোগই খাদ্য সম্পর্কিত এবং ই-কমার্স। বাংলাদেশে  খুব কম স্টার্টআপ ফিজিক্যাল পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশের প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার বিশাল বাজারে স্টার্টআপদের জন্য বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সাম্প্রতিক প্রবণতা উদ্বেগজনক২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সক্রিয় স্টার্টআপের সংখ্যা কমছে। টেকসই বিকাশের জন্য প্রয়োজন সহজ Exit Opportunity, সুসংহত বিধি-বিধান ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। বিনিয়োগকারীর স্বল্পতা এবং বিনিয়োগ প্রাপ্তির দীর্ঘ প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিনিয়োগবান্ধব নীতি, দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা এবং উদ্ভাবনী অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

স্টার্টআপদের বিকাশের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে তার ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান সময়ের স্টার্টআপদের জন্য দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ক্লাউড সার্ভার, ডেভেলপমেন্ট টুলস, সাইবার সিকিউরিটি, হাই-স্পিড ইন্টারনেট এবং বিদ্যুৎ সুবিধা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্টার্টআপদের পক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে এসব সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন।  হাই-টেক পার্কগুলোতে স্টার্টআপদের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সুবিধাসহ কো-ওয়ার্কিং স্পেস প্রদানের ব্যবস্থার কথা থাকলেও তা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

স্টার্টআপ ও বাংলাদেশ দেশে স্টার্টআপ কার্যক্রমকে একটি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর ইকোসিস্টেম। তরুণরা সমাজে বিদ্যমান মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে তাদের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের প্রয়োজন হয় টেকনোলজির। আর এই টেকনোলজি হতে পারে নতুন বা পুরনো কোনো টেকনোলজির কিছুটা পরিবর্তিত রূপ। তা ছাড়া ব্যবসার উপকরণ, পদ্ধতি বা সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে উৎপাদিত পণ্য/সেবা মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমেও স্টার্টআপ হতে পারে। আমাদের দেশের উদোক্তারা বেশির ভাগ সময়ই বিশ্বে বিদ্যমান কোনো ব্যবসার অনুসরণে তার স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে চায়।

 স্টার্টআপ কার্যক্রমে সফল দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নতুন ধারণার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পণ্যের বা ব্যাবসায়িক মডেলের সামান্য পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি উদ্যোগকে সফল উদ্যোগ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, আর এ জন্য প্রয়োজন উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ। ড্যাফোডিল, ব্র্যাকসহ দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রম থাকলেও বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই তা অনুপস্থিত। আইডিয়া প্রকল্প, এটুআই হতে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হলেও তা অপ্রতুল। বাংলাদেশে হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের DEIED   প্রকল্প থেকে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রমটি কিছুটা ভালোভাবে চলছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে একটু যত্নবান হলে স্টার্টআপ কার্যক্রম আরো গতিশীল হতে পারে।

 স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের বিকাশের জন্য প্রয়োজন হয় অর্থের। সরকারের নিয়ম-নীতিগুলো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য সহায়ক নয়। উদ্যোগের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গেলে উদ্যোক্তাদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে ইকুইটি দিতে হলে উদ্যোগটিকে প্রাইভেট লিমিটেড কম্পানি হতে হয়। নতুন উদ্যোক্তারা কম্পানি রেজিস্ট্রেশন করার পরই শুরু হয় তাদের নানা সমস্যা। প্রতিবছর অডিট করা, এজিএম করতে যে অর্থের প্রয়োজন তা সচরাচর স্টার্টআপদের থাকে না। আর অডিট-এজিএম করতে না পারলে পরে তা রেগুলারাইজ করতে হলে যেতে হয় হাইকোর্ট পর্যন্ত। আর এর জন্য যে অর্থের  প্রয়োজন হয়, তা নতুন উদ্যোক্তারা সংস্থান করতে পারে না। তা ছাড়া অথরাইজ ক্যাপিটাল বৃদ্ধি করতে হলেও পোহাতে হয় দারুণ ঝক্কি-ঝামেলা। আর কম্পানির অডিট-এজিএম করার ব্যর্থতা বা সহজে অথরাইজ ক্যাপিটাল বৃদ্ধি করতে না পারার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ পায় না। এটা একটা দুষ্টচক্র, যার আবর্তে স্টার্টআপের উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ এখনো সীমিত, যদিও ২০২১ সালে সফটব্যাংকের প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে বিকাশ দুই বিলিয়ন ডলারের ভ্যালুয়েশন নিয়ে ইউনিকর্নে পরিণত হয়েছিল। ২০২৪ সালে ১২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এলেও এর ৯২ শতাংশ শপআপে কেন্দ্রীভূত ছিল, যা বিনিয়োগের বৈচিত্র্যহীনতা নির্দেশ করে। প্রতিবছর বিনিয়োগ বাড়ার বদলে কমছে, এবং এ পর্যন্ত বিনিয়োগ এসেছে মূলত কম্পানিগুলোর নিজস্ব প্রচেষ্টায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান পিছিয়ে আছে। সরকারি সহযোগিতা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে স্টার্টআপ খাতে সরকারি উদ্যোগ স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড সিড ও গ্রোথ পর্যায়ের স্টার্টআপে ইকুইটি ও কনভার্টিবল ঋণ প্রদান করছে। প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে চালডাল, আই ফার্মার, পিকাবো, শেয়ার ট্রিপ, পাঠাও, আরোগ্যসহ ৩৪টি স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেছে এবং গত ছয় মাসে

ParentsCareDubotech Digital -এ ১১.১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের

DEIED প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও মেন্টরিং শেষে নির্বাচিত ১১০টি সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ এখনো পণ্য উন্নয়ন বা ব্যবসা সম্প্রসারণে কোনো সহায়তা পায়নি; ফলে উদ্যোক্তারা উদ্যোগটির পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারছে না।

বাংলাদেশে স্টার্টআপ সম্পর্কে ধারণায় কিছুটা অস্পষ্টতা রযেছে। বাংলাদেশে সব উদ্যোগকেই স্টার্টআপ বলা হয়ে থাকে। তবে এসব উদ্যোগের মধ্যে অনেক উদ্যোগই ঝরে পড়ে বা সাধারণ ব্যবসা বা এসএমই কম্পানি হিসেবে বাজারে টিকে থাকে। আর অল্প কিছু উদ্যোগই স্টার্টআপ হিসেবে সফল হয়ে থাকে। সরকার এরই মধ্যে স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ কাজ করছে। ইউজিসি এডিবির অর্থায়নে গৃহীত প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেশন অবকাঠামো তৈরি এবং কিছু স্টার্টআপকে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিট্যাল ফার্ম কাজ করছে। এ ছাড়া গ্রামীণ এক্সিলেটরসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। তবে এসবের সমন্বিত প্রচেষ্টা সফল হতে পারে সরকারি নীতিসমূহ সহজীকরণের মাধ্যমে। তরুণ প্রজন্মকে সম্পদ সৃষ্টির কাজে যুক্ত করতে হলে দ্রুত কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, তা না হলে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে অসন্তুষ্টি বাড়বে। আর তরূণ প্রজন্মের অসন্তুষ্টির ফলাফল সম্পর্কে আমরা সবাই অবহিত। তাই কার্যকর স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করার লক্ষ্যে উপযুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই আগামী সরকারের জন্য হবে মঙ্গলজনক।

 

যেমন নির্বাচন আমি চাই

ইমাম-উর-রশীদ, শিক্ষার্থী, ডিপার্টমেন্ট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি

যেমন নির্বাচন আমি চাই

বয়স হওয়ার পর থেকে আমি নিজের চোখে যে নির্বাচনগুলো দেখেছি, সেগুলো হলো ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমার দেখা এই নির্বাচনগুলোর মধ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একমাত্র ২০০৮ সালের নির্বাচনটিই দৃশ্যত অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল বলে মনে করি। তার আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১-এর পঞ্চম, ১৯৯৬-এর সপ্তম এবং ২০০১-এর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও প্রশংসিত ছিল বলে জেনেছি। এই  নির্বাচনগুলো ছাড়া আর কোনো নির্বাচনকে অংশগ্রহণ ও সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন বলে অনেকে মনে করেন না।

যেমন নির্বাচন আমি চাইআমি এবার একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বপ্ন দেখি। আশা করি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন একসঙ্গে কাজ করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন উপহার দিতে পারবে। এই নির্বাচনে যেন আমি এবং আমরা সবাই উৎসাহ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আমাদের ভোট দিতে পারি।

নির্বাচনের পরিবেশ হওয়া উচিত নিরাপদ ও উৎসবমুখর। মানুষ যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং ভয় ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে। নিজের ভোট দেওয়ার মাধ্যমে দেশের প্রতি নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারে। এমন পরিবেশই আমরা চাই।

বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে নির্বাচনকে যেকোনোভাবে প্রভাবমুক্ত রাখা, জোর করে ভোট আদায়ের জন্য ভয়ভীতি সৃষ্টি বন্ধ করা, ভোটের মাঠে ধর্মকে ব্যবহার না করা, ভোটকেন্দ্র দখল রোধ করা এবং অতীতে প্রহসনমূলক নির্বাচনে যেসব অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সত্যি বলতে, আমার মতে গণভোটের ধারণাটি শুধু নতুন নয়, এটি কার্যকরও। এর মাধ্যমে দেশের সব মানুষ একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে যে বাংলাদেশ আসলে কী চায়। কারণ বাংলাদেশ কোনো একজনের বা মাত্র কয়েক শ মানুষের সিদ্ধান্তে চলতে পারে না। দেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় ১৮ কোটি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই হবে।

সবার আগে যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চায় চায়, তাদের অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে, কোনো ধরনের দুর্নীতি ছাড়া ক্ষমতায় আসতে হবে। ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত দেশের বিভিন্ন খাতে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করা এবং প্রকৃত অর্থে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা, যেন দেশ ও দেশের মানুষ আর কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হয়।